শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে

“….Love at first sight বলতে যা বোঝায় আর কি!

সৌম্যদর্শন চেহারা! চোখে মাইনাস পাওয়ারের হাইভোল্টেজ চশমা, গুঁজে পরা সাধারণ একটা শার্ট, আর সাধারণ একটা ট্রাউজারের অন্তরালে অন্তর্হিত তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বসুষমায় আপ্লুত হয়েছিলাম প্রথম দর্শনেই! সাধারণ জ্ঞানের সেই পাঠশালায় অসাধারণ কিছু মুহুর্ত কাটানোর পরম সৌভাগ্যশালীদের তালিকায় আমিও যে একজন! ক্ষণিকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, উনি যে বিষয়ই পড়াবেন, আমি সেই বিষয়টিকেই আপন করব! ‘পঞ্চমে’ সাধারণ জ্ঞানান্তে, সুর ‘সপ্তমে’ তুলে কেবলই পদার্থবিদ্যার সাধনা! কিন্তু সাধনা করলেই তো সবার সিদ্ধিলাভ হয় না; আমারও হয় নি! তাই আজও সেই দ্রোণগুরুর একলব্য শিষ্য আমি! কিন্তু গুরুদক্ষিণা? শুধু আকস্মিক মিলনক্ষণে নতমস্তকে আহরিত পদধূলির শ্রদ্ধাজ্ঞাপন কি দক্ষিণ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠির উপমা হতে পারে?

আশীর্বাদ করবেন স্যার এই হঠাৎপক্ক, দামালমনস্ক প্রাক্তন ছাত্রটিকে!
সন্দীপ বসুকে প্রণতি, আমার পদার্থবিদ্যা শিক্ষার জনক যে তিনিই!

বাঁধানো হয় নি তখনো দাঁতগুলি! ২-১-২-৩ সজ্জায় দাঁতগুলি পুনঃসজ্জিত হয়েছিল যখন, তখন তিনি দাপট ও খ্যাতির যুগ্ম সিংহাসনে! পড়া না করার অযান্ত্রিক টীকাকরণ (জুলপিতে টান!) বা ফুটবল খেলায় রেফিরিং করতে নেমে হলুদ কার্ডের বিকল্প রূপে চারমিনার (সিগারেট!) প্যাকেট ব্যবহার করা; কিংবা বার্ষিক বিদ্যালয় পত্রিকায় ‘রসিকের দপ্তর’ সামলানো তারই কিছু সামান্য নমুনা মাত্র!

আজও প্রান্তজৈবনিক সন্ধিক্ষণের সীমান্তস্থ শ্রী সুবোধকুমার পাল মহাশয় যখন আশীর্বাদী হস্তসঞ্চালন ঘটান, আত্মম্ভরিতার উচ্ছ্বাসে দামামা বাজে বুকে! কারণ? গুরুর হাত বেয়ে যে আশীষগঙ্গার স্রোত প্লাবন জাগায় আমার মাথায়! স্কুলছুট জীবনের একযুগ পেরিয়েও এযে আমার নিত্যলভ্য অভিজ্ঞতা! আশীর্বাদ চেয়ে আপনাকে আরো বিরক্ত করবো স্যার, শুধু আপনার প্রয়োজনে ডাক দেবেন একবার! গুরুদক্ষিণাটা শুধু কাঁচকলাপ্রতিম ‘বুড়ো আঙুল’ -ই দিতে পারে কে বললো?

পেন্সিল হাতে আজও সমান সাবলীল! কিন্তু জ্যামিতিতে চির বামপন্থী, অটুট মনস্ক ফাঁকিবাজ, স্পোর্টসের মাঠে ‘লড়কে লেঙ্গে….’ মনোভাবাপন্ন বুনোহাঁসকে যিনি পেন্সিল ধরিয়ে করে তুলেছিলেন পেন্সিল্পী; তিনি আমার শিক্ষাগুরু শ্রী সুশান্ত ভদ্র মহাশয়!
আজও বাজার-হাট থেকে রিক্সাষ্ট্যাণ্ড, গলি ঘুঁজি থেকে পোষ্টঅফিস, যেখানেই দেখা হোক, গতি স্তব্ধতার ভুক্তভোগী ছাত্র-শিক্ষক দুইগোষ্ঠীই!
আচ্ছা, পাঁচটাকার পান কি কোন গুরুদক্ষিণা হল? তাও আবার ২০১২ সালে কিনে দেওয়া?

অফিসফেরৎ পথপ্রান্তে বিক্রিত (বিকৃত নহে!) চিকেন কে মশলামাধুর্য্যে সমাহিত করে অ্যাশট্রে বার করেছি কি করিনি, দরজায় বৈপ্লবিক কড়া-ধ্বনি! উত্তেজিতচিত্তে অ্যাশট্রেকে ছাই পরশে আঁশটে হবার আগেই নির্বাসিত করে দরজা খুলতেই নিতান্ত সহাস্যবদনে যিনি রাত্রি দশ ঘটিকায় উদিত হলেন, বিদ্যালয় জীবনে তাঁকে ডিসি বলেই জেনেছি!
পরবর্তী ঘণ্টাধিক কালে বিস্তর গল্প, বার তিনেক চা, সামান্য অনুপান সহযোগে সময় কোথা দিয়ে কেটে গেল…. কিন্তু গুরুদক্ষিণা? অপ্রাপ্ত সেই দক্ষিণার মোহে তিনি বারংবার এই অধমের ঘরে আসেন কি না, জানি না! তবে আমার অবর্তমানে মা, বাবার সঙ্গে যে শ্রী দেবব্রত চক্রবর্তীর হামেশাই প্রহরটাক আড্ডা চলে, তা জানি বৈকি!

কিছু সম্পর্কে চলে না কোন আর্থিক দেওয়া নেওয়া! নৈর্বক্তিক থেকে যায় পাওনাগণ্ডার হিসেবঝুলির মহাশূন্যতা। তা যে কেবলই আবর্তিত হয় দুই ব্যক্তিসত্ত্বার আকর্ষণকেন্দ্রীকতার নাভিমণ্ডলের প্রাবল্যজনিত উন্মাদনায়! গড়ে ওঠে সম্পর্কসূত্রতার এক দুর্লঙ্ঘ উপবৃত্ত, যার প্রতিটি স্পর্শক প্রতিনিয়ত গড়ে তোলে নতুন আসঞ্জনশক্তি, নব উন্মেষ, যুগন্ধর সৃষ্টিশীল আবিষ্কারী চেতনাধারা! তারই নাভিমণ্ডলদ্বয় কখনো আখ্যায়িত হয় প্লেটো-সক্রেটিস; কখনো ডেভি-ফ্যারাডে বা আইনষ্টাইন-সত্যেন বোস; কখনো আবার রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ কিংবা আচরেকর-তেণ্ডুলকর যুগ্ম নামপুঞ্জে!

শিক্ষক দিবসের এই মহাপূণ্যলগ্নে বিনম্র শ্রদ্ধার অঞ্জলির নৈবেদ্য পেশ করলাম আমার সমস্ত শিক্ষকগণদের উদ্দেশ্যে!

আর এই শ্রদ্ধার্ঘ্যটি উৎসর্গিত হল আমার সেই সমস্ত শিক্ষকদের শ্রীপাদপদ্মে, যাঁদের নাম নিতে পারলাম না এই যৎসামান্য লেখ্য বয়ানমালায়!

“আমার অন্তরের শ্রদ্ধাসিক্ত প্রণাম জানাই আমার প্রিয়তম শিক্ষকদের শ্রীপাদপদ্মে।”

আশীর্বাদ করবেন, যেন আজীবন আপনাদের আদর্শ সম্মানের সঙ্গে রক্ষা করতে পারি। সংযম আর শিক্ষার যুগলবন্দী আমার পঞ্চ‌ইন্দ্রিয়কে যোগান দিক শক্তি, বুদ্ধি, আর অণুশাসনের অসীম প্রাবল্য! সম্পৃক্ত করুক আমার ভাবী প্রজন্মের ভবিষ্যতকে!

হে শিক্ষাগুরু, আমাকে যোগ্যতম হ‌ওয়ার শক্তি প্রদাণ করুন। তোমার আশীর্বাদের স্পর্শ নিষিক্ত করুক আমার চরিত্রকে। আমার অপাপবিদ্ধ সত্ত্বা যেন সদা ন্যায়পরায়ণ হতে পারে।”

পুনশ্চঃ আশীর্বাদ নয়। আব্দার‌ও নয়। একটা প্রাক্তন ছাত্রের নতমস্তকে করা দাবী।

তবুও-

গুরুদক্ষিণাটা অদেয়ই রয়ে গেল….

আচ্ছা, গুরুদক্ষিণা কি তাঁদের দেওয়া যায়, যাঁদের আমরা আজীবন নিঃশর্ত ভালোবাসার অঙ্গীকারবদ্ধ?
মানে যাঁদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুরুই হয়, যাকে বলে Love at first sight -এই?”

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *