আমার দেখা শ্রীলঙ্কা !

“ঈশ্বর যেমন অনন্ত শক্তির আঁধার, মানুষ ও তেমনি – অবশ্য যদি তার উৎসের সঙ্গে যোগসূত্র অক্ষুন্ন থাকে” – শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

শ্রীলঙ্কা সফর শেষে ঠাকুরের ওই কথাটি মনে হচ্ছিল | ২০ শে মে আমার ছেলের হাত ধরে রওনা হলাম এক অজানাকে জানার প্রয়াসে শ্রীলঙ্কার উদ্দেশে | আমার ছেলে রনির সাথে যেখানেই যাই মনে হয় সবই যেন আমার স্বপ্নে দেখা ব্যবস্থাপনা, সবই প্রথম শ্রেণীর – অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে কয়েকদিন মনপ্রাণ দিয়ে উপভোগ করা | আরও উপভোগ করি সমস্ত মন দিয়ে কারণ যাকে নিয়ে আমার বেশি চিন্তা, সে কি খেলো, কখন ফিরলো – তার শরীর কেমন আছে সে তো আমার সাথেই | আর আমার মেয়ে রেশমীকে মাঝে মাঝেই মনে পড়ছে, সাথে আনতে পারলাম না কারণ ও ওর স্বামী সঞ্জয়-এর সাথে সুদূর আয়ারল্যান্ড-এ বসে ছবি আঁকা ও তার প্রদর্শনী নিয়েই ব্যস্ত | আমার হৃদয় দেবতা সে তো অনুভবে সব সময়ই আমার পাশে, কাজের চাপ নেই, পিঠের ব্যাথাও নেই, সব উধাও | কলম্বোতে নেমেই এয়ারপোর্টের সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে এগোচ্ছি | ওখানকার লোকেদের প্রতিবেশীসুলভ আচরণ মুগ্দ্ধ করেছে | প্রথম শব্দ Ayuboan মানে নমস্কার শিখে ফেলে তার প্রয়োগ শুরু করে দিলাম | চামিন্ডা আমাদের গাড়ির চালক | শহর গ্রাম পেরিয়ে গাড়ি ছুটলো পিনাওয়ালা অনাথ হাতিদের বাসস্থান-এর দিকে | মনে হলো এ যেন আমার বহুদিনের চেনা জায়গা | চামিন্ডা আমাদের ট্যুর ম্যানেজারও | সে কমেন্ট্রি বেশ ভালোই করে | কিন্তু পিনাওয়ালার প্রবেশ ঠিক বিকেল ৫টায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর সেদিন ঢোকা গেল না | ঠিক হলো ফেরার পথে দেখা হবে | পরের গন্তব্যস্থল ঐতিহাসিক শহর ক্যান্ডি এবং সেখানে সবুজের সমারোহে বিশাল লেক | ন্যাচারাল লেক -এর মতো দেখতে হলেও চামিন্ডা জানালো এটা মানুষের তৈরী লেক | তার চারিদিকে সবুজ গাছে ভরা ব্রিটিশদের তৈরী কুইন্স হোটেল, হেরিটেজ বিল্ডিং আর্ল রেসিডেন্সি বেশ দেখার মতো | কয়েক একর জমিতে বড় বড় গাছ, কোলাহলহীন অপূর্ব ভাবে সুসজ্জিত রিসোর্ট, না দেখলে ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব |

পরেরদিন সকাল ৯টাতে তৈরী হয়ে বের হলাম শহর পরিদর্শনে আবার ক্যান্ডি লেক ঘুরে ঘুরে শহরে ঢুকলাম এক ঝড় ঝড় মুখর বাদল দিনে অপূর্ব রয়্যাল গার্ডেনে | বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় দিয়েই বাগান দেখতে দেখতে কফিশপে আশ্রয় নিলাম | অবিশ্রান্ত বৃষ্টি, মেঘেদের গর্জন, এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত তাদের ছোটাছুটির খেলা দেখে আমাদের মনও এক অজানা আনন্দে মেতে উঠলো | অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভায় বিভোর হয়ে গেয়ে উঠলাম মনোমোর মেঘের সঙ্গীই..উড়ে চলে দিক দিগন্তের পারে নিঃসীম শূন্যে – রিমঝিম রিমঝিম রিমঝিম | রনি YouTube এ গানটা বাজিয়ে দিলো প্রাণ মন দিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করার সুযোগ ঈশ্বর করে দিলেন |

বৃষ্টিতে রয়্যাল গার্ডেনের প্রাকৃতিক শোভা দেখতে দেখতে কফি শেষ করে পাড়ি দিলাম ক্যান্ডি শহর পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে | তাদের শিল্পকলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জেম জুয়েলারির প্রাকৃতিক উৎসের আবিষ্কার, তার শোধন এবং শোরুমে ওদের গহনার প্রদর্শনী এবং শিল্পীদের শিল্পকলা ও নিপুণতা দেখে বিশ্বাস করাই কঠিন | ব্যস্ত শহরের নানা মনোরম শোভা দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছলাম ডালডা মালিগাওয়া ফেমাস বুদ্ধিস্টস টেম্পলে | ভাবগম্ভীর অপূর্ব বাজনায় মুখরিত এই মন্দির প্রাঙ্গণকে সমৃদ্ধ করেছে ভগবান বুদ্ধের দন্তের উপস্থিতি | মন্দিরের ইতিহাসে কথিত আছে , কোনো এক রাজা রাজত্বের লোভে ওই দন্তের উপর নিজের অধিকার স্থাপনের প্রয়াসস্বরূপ অনতিবিলম্বে তাকে নিজের রাজপাট খোয়াতে হয়েছিল | মন্দিরের সিঁড়িতে আরেকটু হলে অন্যমনস্কতার ফলে পরে যেতে যেতে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির আশীর্বাদে রক্ষা পেলাম | সম্বিৎ ফিরতে উপলব্ধি করলাম সে যাত্রায় আমাকে বাঁচিয়েছিলো চামিন্ডা | ভগবান বোধয় এভাবেই সঠিক সময়ে নিজেদের ভক্তদের রক্ষার্থে দূতপ্রেরণ করে থাকেন | মন্দির বন্ধ না হওয়া অবধি ওখানে বসে ভক্ত সমাগম ও মন্দিরের ঐশ্বরিক পারিপার্শিক পরিবেশের শোভা উপভোগের মাধ্যমে না জানি সময়টা কোথা দিয়ে অতিবাহিত হয়ে গেল | সেদিন সন্ধেয় রিসোর্টে ফিরে ডিনার সেরে পরের দিনের গন্তব্যস্থল শ্রীলঙ্কার লিটল ইংল্যান্ড “Neuwaracliya” -এর কল্পনাপ্রসূত ছবি মননে এঁকে নিদ্রা গেলাম |

শুনলুম পাহাড়, লেক, গল্ফ কোর্স এ ঘেরা ব্রিটিশদের তৈরী এই শহর | পরের দিন সকাল ৮:৩০ এ ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা দিলুম সেই লিটল ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে | পাহাড়, চা-বাগান, মহাবালী নদীতে ঘেরা রাস্তা | রাস্তার মাঝে মাঝে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য ও ঝর্ণা উপভোগ করার জন্য কোথাও কোথাও রয়েছে ভিউ পয়েন্ট | কখনো ঘন কালো মেঘে ঢাকা আকাশ, পাহাড় আবার কোথাও রড ঝিলমিল পাহাড়ের মনোরম চূড়ায় মেঘেদের লুকোচুরি খেলা. মাঝে মাঝেই বিস্তীর্ণ চা বাগান সাথে ভিসিটরদের জন্য চা পানের আমন্ত্রণ কেন্দ্র | বিভিন্ন্ রকমের চায়ের ঘ্রান ও আস্বাদন নিতে নিতে এগিয়ে যাওয়া লিটল ইংল্যান্ডের পথে, যেতে যেতে দামেরও টি গার্ডেনের বিশালত্ব,প্রসেসিং সেন্টার, পাহাড়ে ঘেরা রাম্বোডিয়া ওয়াটার ফলসের পাশে বসে মধ্যান্য ভোজন, লাভার লিপ ভিউ পয়েন্ট, বিস্তীর্ণ সবুজে ঘেরা গল্ফ কোর্স এর ধার দিয়ে চোখ ধাঁধানো ব্রিটিশ স্থাপত্য দেখতে দেখতে ওদের বর্তমান গভর্নর হাউসের কাছেই ব্রিটিশ আমলের গভর্নর হাউস এখন গ্রান্ড হোটেল | যখন ওখানে পৌছালাম আমরা যেন রয়্যাল গেস্ট, এত অপূর্ব তাদের আপ্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা | বড় বড় ঘর, ঝাড়লণ্ঠনের রকমারি বাহার, লাল কার্পেট পাতা সিঁড়ি, গেস্ট রিসেপশন রুম, পিয়নোর মিষ্টি বাজনার সুর, সব মিলিয়ে একদম রাজকীয় ব্যাপার | এতটা পথ পেরিয়ে যখন ওখানে পৌছালাম ব্রিটিশ স্থাপত্য দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল | গ্রান্ড হোটেলের ওপেন রেস্তোরায় নৈশ্য ভোজ সেরে গায়ে গরম জামাকাপড় চাপিয়ে হাঁটতে বেরোলাম | যতটা হাঁটা যায় ঘুরে ঘুরে শান্ত সুন্দর হেরিটেজ বিল্ডিঙে ভরা রাতের শহর তা দেখতে খুবই ভালো লাগছিলো | অবাক লাগছিলো ভগবানের সৃষ্টি প্রকৃতি ও মানুষের আবিষ্কারের ক্ষমতা দেখে | শুনলুম এখানে ধনী লোকেরা তাদের অবসর বিনোদনের জন্যে আসে, এখানেই সেই ঐতিহাসিক অশোকবন যেখানে সীতাকে রাবণ বন্দি করে রেখেছিলো, এখন সীতা এলিয়া নামে বিখ্যাত | জানলাম এলিয়া মানে আলো | পরের রাজকীয় ব্রেকফাস্ট সেরে শহর পরিক্রমায় বেরোলাম | সবুজ রেস কোর্স, গ্রেগরী লেকের বিশালত্ব দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, প্রচন্ড বৃষ্টির জন্য গাড়ি থেকে না নামতে পেরে লেক দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সীতা এলিয়াতে | এ অদ্ভুত এক পাহাড়, ঠিক যেন হনুমানের মুখের মতো, সীতাকে পাহারা দিচ্ছে | বন্দিস্থানটা এখন মন্দিরে পরিণত হয়েছে | পূজা পাঠঃ, হোম, প্রদক্ষিণ,দর্শনার্থীদের ভিড়ে আমরাও কোনো রকমের সীতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে রওনা হলাম অতৃপ্ত মন নিয়ে ভিক্টোরিয়া গার্ডেনের দিকে | বৃষ্টির জন্য গার্ডেনটা বাইরে থেকেই দর্শন ও অনুভব করতে হলো | তারপর এলুম স্ট্রবেরি প্লানটেশন দেখতে | সায়েন্টিফিক্যালি অল্প জায়গায় বেশি ফলন কি ভাবে করা যায় দেখে তো অবাক, এও কি সম্ভব?? ওখানে বসে স্ট্রবেরি খেয়ে গ্রেগরী লেক লাঞ্চ সেরে বৃষ্টি ও প্রকৃতির রূপ উপভোগ করতে করতে হোটেলে ফিরে এলুম | কিন্তু রুমের চাবি ব্যাগে না পাওয়ায় ঘরে ঢোকা গেল না | রনি ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে ঘরে ঢুকলেও আমি চাবির সন্ধানে চামিন্ডাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম | যেখানে যেখানে ব্যাগ খুলে পেমেন্ট করেছি মনে করতে করতে দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সীতা এলিয়েতে, শান্ত কোলাহল বিহীন মন্দির প্রাঙ্গন, পুরোহিতরা উচ্চস্বরে মন্ত্র পড়ছে, যজ্ঞ চলছে ঠিক যেমনটি আমি চাই | ভুলেই গেলাম চাবির কথা | মন ভরে পবিত্র স্থানটা উপভোগ করলাম, বেরিয়ে দেখলুম চামিন্দা চাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে | অবাক হয়ে শুধু ভাবলুম এওকি সম্ভব! বিকেলে লোকাল মার্কেটে কিছু শপিং করে হেঁটে হোটেলে ফিরলাম | পরেরদিনের আমাদের গন্তব্য সমুদ্রে ঘেরা শহর বেন্টোতা |

পথে পেলাম পিননাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফানেজ, সেখানে ছোট, বড়, মাঝারি বিভিন্ন্য মাপের হাতি দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে | ওদের প্রশক্ষকরাই কেবল ওদের কথা বোঝে আর ওরাও তাদের নির্দেশ মতো চলে | এক একটা দোল এক এক সময় লাইন দিয়ে লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে স্রোতস্বিনী নদীতে নেমে এক দেড় ঘন্টা ধরে জলকেলী করে | সে এক উপভোগ করার মতো দৃশ্য, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়ে ওদের নিয়মানুবর্তীতা দেখে | কেউ শুয়ে কেউ বসে স্নান করছে, কেউ বা দুষ্টুমি করে তাদের নিয়ম ভাঙার চেষ্টার জন্ন্যে মাহুতদের তাড়া খাচ্ছে, পুরো ব্যাপারটাই বেশ উপভোগ করার মতো | পথের ধরে হাতিদের বর্জ্যপদার্থ(Dung) দ্বারা তৈরী হ্যান্ডমেড পেপার, গহনা, বিভিন্ন্য সাইজের হাতি, বনমানুষ, ইত্যাদি কত কিছু তৈরী হচ্ছে যা যা বিশ্বাসের অতীত | হাতিদের অরফানেজ এতই মনোরম যে ছেড়ে আসতে কিছুতেই মন চাইছিলনা তাই বেন্টোতা পৌছাতাতে বেশ রাত হয়ে গেলো | বেন্টোতা যাওয়ার বেশির ভাগ পথই কাঠচাপা ফুলে ঘেরা সমুদ্র সৈকত যার মধুর গন্ধে বিভোর হয়ে পৌঁছেগেলাম তাজ গ্রূপের রিসোর্ট বিভানতাতে | ওখানে চাঁপাফুলের মালার সহিত ঠান্ডা পানীয় দিয়ে আমাদের স্বাগত জানানো হলো | যতই ঘুরে ঘুরে দেখছি মনে হচ্ছে এ যেন এক স্বপ্নপুরী | সুইমিং পুল টা অবস্থিত চতুর্থ তলায় সমুদ্রের দিকে মুখ করা,সঙ্গে বাগান সহিত ওপেন রেস্তোরা | সেখানেই কফি খেতে খেতে সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে পথের ক্লান্তি দূর করলাম | তারপর নৈশভোজ সেরে রনি পুলে সাঁতার কাটলো আর আমি সমুদ্র উপভোগ করতে করতে হারিয়ে গেলাম আমার ভালো লাগার দেশে | ভগবানের এই অপূর্ব সৃষ্টি উপভোগ করার সুযোগ পাওয়ার জন্য তাকে বারবার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম আমার হৃদয়ের অন্তরাল থেকে | পরের দিন ব্রেকফাস্ট সেরে শহর পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়লুম | স্পিডবোটে করে সমুদ্রের ব্যাকওয়াটার ঘেরা আইল্যান্ড দেখা, মুনস্টোনের খনি, তার আবিষ্কার ও গহনার প্রসেসিং দেখলাম আর বিস্ময় অবাক হলাম এখানকার শিল্পীদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা দেখে | সেখান থেকে উপহার হিসেবে পেলাম কিছু খনি থেকে তোলা র-মুনস্টোনে | সেখান থেকে পৌঁছে গেলাম কচ্ছপদের রিহ্যাবিলিটেশন হোমে | সেখানে নানা রঙের নানা আকৃতির কচ্ছপ যা আমি আমি কখনোই প্রত্যক্ষ করিনি | কোনটা অন্ধ কোনটা হাত পা কাটা বিরল প্রকৃতির সব কচ্ছপ, কোনো কোনোটার খোলসে আঁকা বিচিত্র কারুকার্য দেখে অবাক হয়ে ভাবতে হয়ে ঈশ্বরের এ কি নিখুঁত শিল্পকলা | এদেরই মধ্যে রয়েছে একটি সাদা, হলুদ ও কালো রং দিয়ে আঁকা কচ্ছপ, তার নাম রাখা হয়েছে মাইকেল জ্যাকসন | শুনলুম দুলক্ষ ডিমের মধ্যে একটি মাইকেল জ্যাকসন পাওয়া যায় | এরপর রেশম সিল্কের কারখানায় তার প্রসেসিং দেখে এবং কিছু শপিং করে পাড়ি দিলুম আর এক সমুদ্র ঘেরা শহর ভ্যালিগামার উদ্দেশ্যে |

রাস্তায় যেতে যেতে পথে পড়লো ডাচদের তৈরী সমুদ্রের পারে অবস্থিত ফোর্ট, তার ভেতরে রয়েছে বিশাল সাজানো এক স্বপ্নপুরী, কি নেই সেখানে! উন্নতমানের শপিং সেন্টার, হাইকোর্ট, হাসপাতাল, স্টেডিয়াম, স্কুল, কলেজ, পোস্ট অফিস, সে এক এলাহী ব্যাপার | শুনে অবাক হলুম সুনামি এদের স্পর্শও করতে পারেনি | তারপর সমুদ্রের পারে বসে মধ্যাহ্নভোজ সেরে দিনের শেষে আবার রওনা ভাল্লেইগ্যামার উদ্দেশ্যে | সেখানে পৌঁছে সমুদ্রের পারে ম্যারিওট হোটেলের বারান্দায় বসে রাতের দিগন্ত প্রসারিত সমুদ্রের দেখে মন উদাস হয়ে উঠছিলো, ক্লান্তি নেমে আসছিলো শরীর ও চোখে, তাই আর দেরি না করে নিদ্রাকে আলিঙ্গন জানিয়ে সেদিনের মতো যাত্রার সমাপ্তি করলাম | পরের দিন ভোর ছটায় মাঝসমুদ্রে তিমি মাছ ও ডলফিন সফরের জন্যে চামিন্দার সব আয়োজন তৈরী | প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার যাওয়ার পর পৌছালাম স্পিড বোট ছাড়ার উৎসে, মনে মনে ভয় নিয়েই বোটে উঠে পড়লাম | আধঘন্টার মধ্যে উত্তাল সমুদ্রের মাঝে পৌঁছানোর সাথে সাথে যাত্রীদের বমি করার আওয়াজে কান ঝালাপালা করতে লাগলো | প্রায় অনেককেই অন্য বোট এসে পাড়ে নিয়ে গেল | সমুদ্রের এই অশান্ত রূপ দেখে তার সম্বন্ধে এক নতুন ধারণার সৃষ্টি হলো যা পাড় থেকে তাকে দেখে কখনোই হওয়া সম্ভব নয় | যত তিমি মাছেদের দেশে এগোতে থাকলাম মাঝে মাঝেই প্রত্যক্ষ করা গেল কখনো বা পাল তোলা নৌকার মতো আবার কখনো বা পিঠ ভাসিয়ে ডুব দেয়া বিশাল আকৃতির সব তিমি মাছ | সে এক অপূর্ব অভাবনীয় দৃশ্য, আনন্দে মন উচ্ছসিত হয়ে উঠলো | একরাশ উত্তেজনা আর এই মনোরম স্মৃতি মননে নিয়ে সুস্থভাবেই আমরা পোর্টে ফিরলাম | এবার রওনা কলম্বোর উদ্দেশ্যে | তার আগে এই ভাল্লেইগ্যামার সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে তাকে মন থেকে বিদায় জানিয়ে যখন গাড়িতে উঠতে যাবো তখন দেখি অজান্তে, গোপনে কখন যেন সমুদ্রের নোনা জল এসে আমাদের জুতো মোজা ভিজিয়ে আমাদের বিদায় সম্বর্ধনা জানিয়ে গেছে | আমার তার ফেয়ারওয়েল সাদরে গ্রহণ করে গাড়িতে উঠলাম | গাড়ি ছুটলো সুদীর্ঘ বাইপাস ধরে হাই স্পীডে, সূর্যাস্তের অপূর্ব মনোরম শোভা দেখতে দেখতে সবুজের মধ্যে দিয়ে সমুদ্র পারে অবস্থিত কলম্বোতে এসে পৌছালাম সন্ধ্যার পর | আজই সফরের শেষদিন, কাল সকাল ৬ টাতে এয়ারপোর্ট এ রিপোর্টিং তাই আজই ঘুরেঘুরে কলম্বো শহর দেখতে লাগলাম | ব্রিটিশ স্থাপত্য বিশাল সবুজ সুসজ্জিত পার্ক | আমার কিছু ইউরোপিয়ান শহর দেখার সুযোগ হয়েছিল তাই কলম্বো শহরটা দেখে মনে হলো এও তার থেকে কোনও অংশে কম নয় | সারারাত যানবাহন চলছে বড়োবড়ো আলো ঝলমলে শপিং মল ঘুরতে ঘুরতে সব গিফট আইটেম দেখতে দেখতে পেলাম রাবনের মুখের নানারকম সাইজের মূর্তি, কোনটা শান্তির জন্য, কোনটা আগুন থেকে রক্ষা পেতে, কোনটা বন্ধুত্ব ইত্যাদি | এই নানাবিধ ফ্রিজ ম্যাগনেট কিনে, শহর ঘুড়ে রাত সাড়ে এগারোটায় আমাদের হোটেল গলাধারিতে পৌছালাম | সারারাত ধরে শহর টাকে ব্যালকনি থেকে উপভোগ করলাম কারণ পরদিন ভোর চারটে তে আমাদের চেকআউট | নিচের প্রশস্ত রাস্তা, সমুদ্র, চলমান গাড়িগুলো দেখেই রাত কেটে গেল | চারটেতে চামিন্ডাকে জিজ্ঞেস করলাম তোমরা “গুড মর্নিং”-কে কি বোলো? ও বললো শুভ উদায়া, ওকে শুভ উদায়া জানিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে পারি দিলাম | শহর দেখতে দেখতে নিগম্ব যদি, সমুদ্র পেরিয়ে, ভোরের সূর্যের আলো উপভোগ করতে করতে কখন যে এয়ারপোর্ট পৌঁছেগেলাম বুঝতেই পারলুম না |মনে পড়ে গেলো এয়ারপোর্টে নামার সময় একটা সুন্দর মেয়ে হাত নমস্কারের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, নিচে লেখা আইবুয়ান, আমরাও কলম্বো কে আইবুয়ান বলে যাত্রা শেষ করলাম | মন ভরে রইলো শ্রীলংকার সমুদ্র বেষ্টিত জায়গাগুলোয়, সবুজে ভরা অশোকবনের পাশে নেচার মেড হনুমানের মুখের মতো পাহাড় যেখানে আমাকে দুবার যেতে হয়েছিল | একবার প্রদক্ষিণ করে পুজো দিয়েছিলুম যা আমার একান্ত মনের মতো হয়নি | সেই জন্যেই হয়তো হোটেলের ঘরের চাবি খুঁজে না পাওয়ার জন্য চাবির খোঁজে আবার সেখানেই ফিরে যেতে হয়েছিল মনের মতো করে পুজো দেয়ার জন্য আর অনুভব করার জন্য | চাবিও উদ্ধার হলো, অবাক হয়েছিলাম চাবিটা তো অনন্য কোথাও পরতে পারতো, তবে এখানেই কেন? সাধারণত হোটেল থেকে বেরোলে রিসেপশনে চাবি জমা করে যাই, এবারেই কেন ব্যাগে রয়ে গেল? কত জায়গায় তো বসেছিলাম, ব্যাগ খুলেছিলুম, পেমেন্ট করেছিলাম, ডায়রিও লিখেছিলাম কিন্তু চাবিটা সীতা আলিয়া তেই পড়ে গেলো কি করে? এর ব্যাখ্যা দেয়া আমার সাধ্যের অতীত | ক্যান্ডিতে বুদ্ধিস্ট টেম্পলে চামিন্ডার হাত ধরে আমি বড়ো এক্সিডেন্ট থেকে বেঁচেছিলাম আর আশ্চর্য্য ভাবে সীতা আলিয়াতে আমাকে দ্বিতীয় বার আসতে হলো, মনে হচ্ছিলো প্রতিনিয়ত ঈশ্বর আমাদের সাথেই আছেন, আমাদের রক্ষা করছেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞাতায় মন ভোরে গেল. আমাদের শুধু একটু বিশ্বাস,ভালোবাসা আর নির্ভরতা প্রয়োজন তার প্রতি | মনে পড়ে গেল গীতা আর আমার ঠাকুরের সেই বাণী ” আমি সকল জীবের হৃদয়ের মধ্যে অবস্থিত. আমা হইতেই স্মৃতি, জ্ঞান, বিবেচনা শক্তি জীব সকল পাইয়া থাকে”

গীতা..
” তিনি সাড়া দেন অন্তরের গভীর অনুরাগের আহ্বানে. তিনি সংবাদ রাখেন আমাদের হৃদয়ের প্রত্যেকটি স্পন্দনের”
শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র..

 

                                                                                                                                                                                                                                                           ——– আরতি গোস্বামী দত্ত

 

You may also like...

3 Responses

  1. অসাধারণ একটা লেখা! হৃদয়ের গহীনে একটা তোলপাড়ের অনুনাদ অনুভব করলাম পড়তে পড়তে!

    বাংলা লেখা বিশেষ পড়ার সময় বা সুযোগ দুটোই আজ অপাঙক্তেয় শ্রেণীতে চলে গেছে বিভিন্ন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে। তবুও লেখাটা পড়তে বাধ্য হলাম শুধুমাত্র প্রথম শব্দবন্ধে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের নাম পড়ে।

    আমার সাম্প্রতিক গবেষণার বিষ়বস্তু কোন এক মহাবিপ্লবী। ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল একটা সময়। তখন‌ও তিনি ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নন, অনুকূল চক্রবর্তী! যিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। কিন্তু সরাসরি ‘মহাবিপ্লবী-র মহাবিপ্লবে’ অংশ না নিয়েও ‘নেই তাই খাচ্ছো… থাকলে কোথায় পেতে?’ অনুরূপ কালিদাসী ধাঁধার ছন্দে একটা মহাগুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন!

    শ্রীলঙ্কা সম্পর্কে একটা কৌতুহল আগাগোড়াই আছে। কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত পড়াশোনাকে সম্বল করে তার মূল্যায়ন করা, আমার মত অতি সাধারণ একজনের পক্ষে অসম্ভব। ‘ওয়ার্ণাকুলাসারাইয়া পাটবাণ্ডিগে উশান্ত যোসেফ চামিণ্ডা ব্যাস’ (ক্রিকেটবিশ্বে বৃহত্তম ব্যাক্তিগত নামের অধিকারী!) নামটা আরো একবার মনে এসে গেল জনৈক চালকের চরিত্রের নেপথ্যে! অশোক বনের কিছু ঘটনা… (যা রামায়ণের অন্তর্গত) মনে এল…!

    লেখিকার কাছে আমি আশীর্বাদপ্রার্থী! যদি অনুরূপ লেখনশৈলীর শতাংশের ভগ্নাংশের অধিকারীও হতে পারি, নিজেকে ধন্য মনে করব!

    • আরতি says:

      তোমার অসাধারন বাংলা লেখার পারদর্শিতা এবং জ্ঞান প্রশংসার অধিকার রাখে । তোমায় ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না । ঠাকুর তোমার ভালো করুক |

  2. স্বয়ং says:

    আপনাদের আশীর্বাদ-ই মূলধন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *