রাতের নীলগিরি

ভ্রমণ ও ভ্রমণ কাহিনী এই দুটো জিনিসই প্রায় সব বাঙালির জীবনের অনেকখানি জুড়ে বিরাজ করে, তাই আমি বা ব্যাতিক্রম হই কেন? এই শহুরে আদব কায়দা আর কর্মব্যস্ত জীবন যখন দুর্বিষহ বলে মনে হয়, আমরাও আর পাঁচজন  বাঙালির মতো বেরিয়ে পরি অজানার হাতছানিকে সাড়া দিয়ে |

এইরকমই এক অজানাকে জানার গল্প আজ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেবো বলে কাগজ-কলম নিয়ে তৈরী আমি | বহুদিন পরে ল্যাপটপ ছেড়ে কাগজকলম নিয়ে ভ্রমণকাহিনী লিখতে বসে নিজেকে বেশ সাহিত্যিক বলে মনে হচ্ছে| তা যাইহোক  মূল গল্পে ফেরা যাক | একদিন হঠাৎ আমি আর আমার নিকটতম বন্ধু তথা পতিদেব সঞ্জয় মিলে ঠিক করলাম এইবার  একটা ব্রেক চাই | অনেকদিন এই চার দেয়াল হাঁফিয়ে তুলেছে আমাদের, তদুপরি সামনে আসন্ন একটা লম্বা উইকেন্ড আমাদের এই ইচ্ছেটাকে বাস্তবায়িত করতে বেশ সাহায্যই করলো বটে………. তা কোথায় যাওয়া যায়?? অনেক ভেবে খুঁজে ঠিক হলো বেরিয়ে পড়তে হবে এক নতুন জায়গার উদ্দেশে — ভালপারাই!! জায়গাটার নাম শুনেই কেমন যেন মন আগেই তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়েছিল রাস্তায় | অতএব সশরীরে তো বেরিয়ে পড়তেই হয় মনের খোঁজে |

যেমনি ভাবা তেমনি কাজ | পরেরদিন ভোরবেলায় বেরিয়ে পড়া হলো টাইগার, অর্থাৎ আমাদের সব সফরের সঙ্গী আমাদের চার-চাকা “Chevrolet Beat”-e চড়ে | হাইওয়ে ধরে ছুটতে লাগলো টাইগার | মুক্ত হাওয়া, খোলা আকাশ, হালকা রবীন্দ্রসংগীত আর ভোরের আলোয় রাঙা দিগন্ত …… সব মিলিয়ে দারুন এক পরিবেশ |

রাস্তার ধারের ধাবা থেকে কখনো চা, কখনো হালকা কিছু স্নাক্সএর জোগানে ভোজন-রসিক বাঙালির মন ও পেট দুইটি বেশ আনন্দিত হতে থাকলো | এইভাবে একের পর এক শহর পেরিয়ে ছুটতে থাকলো Tiger. এক এক করে পেরিয়ে গেলাম Hosur, Salem, Erode, Pollachi, Thrissur | কর্ণাটক থেকে শুরু করে তামিলনাড়ু ছুঁয়ে কেরালার হাইওয়ে দিয়ে ছুটতে লাগলো আমাদের সওয়ারি | শহর পেরিয়ে গ্রাম, গ্রাম পেরিয়ে পাহাড় — কখনো রাস্তায় জংলা হাতির দল, কখনো বা পাহাড়ি ‘hair-pin bend’  এ দাঁড়িয়ে থাকা দুর্লভ Nilgiri Tahr এর আলিঙ্গন, আবার কখনো পাহাড়ি ঝর্ণা ‘Athirapalli’……. একের পর এক মনোরম দৃশ্য মনোরঞ্জন করতে থাকলো আমাদের |

প্রায় ৫০০ কিমি এইভাবে চলার পর যখন সন্ধের আকাশ রাঙা হয়ে উঠেছে, পাখিরা দল বেঁধে সেই আকাশ পথে নিজ নীড়ের দিকে পাড়ি দিয়েছে আমরা তখনো পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি ভালপারাই এর খোঁজে | ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়ছে শরীর ও মন, পেটের খিদের তীব্রতা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু রাস্তায় চোখ যতদূর যাচ্ছে শুধু দেখা যাচ্ছে পাহাড়ি জঙ্গল, পশুপাখির ডাক আর বুনো গন্ধ | সন্ধের অন্ধকারে আস্তে আস্তে ডুবতে থাকলো আকাশ, পাহাড় আর  জঙ্গল … গাড়ির হেডলাইট তখন একমাত্র সহায়, যতদূর হেডলাইটের আলো ততদূরই দৃষ্টি, বাকি সব নিবিড় অন্ধকারাচ্ছন্ন |

বিপদের আশঙ্কা যতই বাড়তে থাকলো, সাহসী মন ততই দুর্বল হতে থাকলো, আর সেই মুহূর্তে ভগবানের নাম নেওয়া ছাড়া আর কিছুই মাথায় এলো না | রাস্তার ধারে গাড়ি থামিয়ে যে কাউকে রাস্তা জিজ্ঞেস করবো বা নিকটস্থ  জনবসতি খুঁজবো তার উপায় নেই, মোবাইল টাওয়ার নেই আর তাই অন্ধের জষ্টি Google Map ও নেই | রাস্তার এক ধারে রয়েছে  প্রকান্ড পাহাড়ি গাছের সারি আর অপর দিকে গভীর খাদ | এই রাস্তায় দাঁড়ালে বিপদের সম্ভাবনা বাড়বে বৈ কমবে বলে মনে হচ্ছিলো না | তাই আর কিছু না ভেবে চলতে থাকলাম অজানা শহরের খোঁজে |

এইভাবে আরো ২-৩ ঘন্টা পথ চলার পর, তখন প্রায় সন্ধে ৭:৩০ টা, দূরে একটা ছোট্ট শহরের আলো দেখা গেল – আমরা দুজনেই তখন পুরোপুরি বিধ্বস্ত, ক্ষুধার্ত, সারাদিনের ক্লান্তি যেন চোখদুটোর উপর সবলে চেপে বসতে চাইছিলো | তা যাইহোক শেষপর্যন্ত Valparai খুঁজে পেয়ে দুজনেই বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করছিলাম | মনে আনন্দ হচ্ছিল বটে, কিন্তু সেটা প্রকাশ করার ক্ষমতা খুবই কম অবশিষ্ট ছিল শরীরে বা মননে |

Valparai একটা ছোট্ট পাহাড়ি শহর, চা-বাগানে ঘেরা এই শহর অবস্থিত তামিলনাড়ুর নীলগিরি পর্বতমালার কোলে, অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সুসজ্জিত এই ছোট্ট শহর |

ভালপারাই পৌঁছে শুরু হলো আমাদের হোমস্টের খোঁজ, যেহেতু শহরটা খুব বড় নয় আর খুব বেশি মানুষের কাছে পরিচিত নয়, ফলে খুব একটা টুরিস্ট  আসেনা এখানে (এক্কেবারে যাকে বলে virgin tourist attraction) | হোমস্টেতে ফোন করায় সেখান থেকে লোক এসে আমাদের পথপ্রদর্শন করে নিয়ে গেল সেই জায়গায় | কিন্তু গাড়ি যেখানে থামলো সেখানে কোনো গেস্টহাউস বা থাকার জায়গা বিশেষ দেখতে পাওয়া গেলো না | আমাদের পথপ্রদর্শক ইশারায় আমাদের তাকে অনুসরণ করতে বললে, আমরাও আর বেশি মাথা না ঘামিয়ে তাই করলাম | এক সরু গলির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা, রাত বেশ বেড়েছে তখন, ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৯টা ছুঁইছুঁই, মানুষজনের আওয়াজও কমে এসেছে ……… তা কিছুদূর এগোবার পর সেই আমাদের পথপ্রদর্শক ভদ্রলোকটি এই গলির মধ্যেই অবস্থিত একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকে গিয়ে আমাদের তার দোতলায় উঠে যেতে বললে | তার বলা অনুযায়ি আমরাও তাই করলাম | গলির মধ্যে ঢোকার সময় থেকে আমার মন মেজাজ দুটোই বেশ খারাপ হয়ে গেছিলো (যদিও সঞ্জয় বেশ উৎসুক হয়ে পড়েছিল ‘Hare Krishna Hare Ram’-এর সেই নেপালি গলিগুলোর সঙ্গে এর তুলনা টেনে) | বেড়াতে এসে ভেবেছিলাম পাহাড়ের কোনো এক চা-বাগানে ঘেরা মনোরম গেষ্টহাউসে থাকবো, কিন্তু বিধি বাম ! অগত্যা আর কোনো উপায় না পেয়ে চুপচাপ উঠে গেলাম সেই বাড়ির দোতলায় | বাড়ির কেয়ারটেকার খুলে দিলো ঘরের দরজা |

ঘরে ঢুকেই প্রথম উপলব্ধি হলো ঘরের ভেতরের সঙ্গে বাইরের কোনোই সামঞ্জস্য নেই | ঘরটা অতি নিখুঁতভাবে কোনো সুরুচিসম্পন্ন ব্যক্তির দ্বারা সুসজ্জিত, দুটো বেডরুম, একটা হল মিলিয়ে যাকে বলে একটা কমপ্লিট ফার্নিশড ফ্ল্যাট |  হলে রয়েছে একটা সোফাসেট এবং একটা প্রকান্ড টিভি কেবিনেট, আর সেই ক্যাবিনেটে সাজানো অনেক দামি ঘর সাজানোর দ্রব্যাদি, অনেকগুলো টেডিবিয়ারও  চোখে পড়লো সেই ক্যাবিনেটে | তা যাইহোক ঘর পরিক্রমা শেষ হওয়া মাত্রই মনে পরে গেল ক্ষুধার্ত উদরের কথা —— এই বাড়িতে আসার সময় ভালো মন্দ কোনো রকমেরই খাবার দোকান চোখে পড়েনি, তাই আদৌ সে রাতে খাবার জুটবে কিনা বেশ সন্দেহ হচ্ছিল | অনেক ভেবে মনে পড়ল সেই  কেয়ারটেকারএর কথা | তাকে ডেকে অনেক অনুরোধ করায় অনেকক্ষণ বাদে সে দুটো খাবারের প্যাকেট এনে আমাদের ঘরে পৌঁছে দিলো | প্যাকেটে কি আছে না জেনেও মনে যেন অনেকখানি বল পাওয়া গেল | আমরা দুজনেই খিদের তাড়না আর সামলাতে না পেরে প্যাকেটদুটোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম |

প্যাকেট খোলামাত্রই সব উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে বেরিয়ে এলো ৪টে শুকনো রুটি আর দুই প্যাকেট মালাবার ফ্রাইড রাইস, তাও সেই ফ্রাইড রাইসকে কারিপাতা দেয়া ভাতভাজা বললেও অত্যুক্তি হয় না | খিদের জ্বালা তখন এতই তীব্র আর কিছু ভাবার অবকাশই রইলো না | সেই খাবার খেয়ে কোনোমতে সেদিন রাতের মতো খিদের জ্বালা মেটানো গেল | তখন প্রায় রাত ১১টা বাজে ——– দুজনে কোনোরকম একটু ফ্রেশ হয়ে একটা বেডরুমে গিয়ে আলো নিভিয়ে শুয়েছি | চোখ লেগে এসেছে ঘুমে, হঠাৎ সম্মুখীন হতে হলো এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার | যেই টিউবলাইট আমরা নিভিয়ে শুয়েছিলাম হঠাৎ সেটাই নিজে থেকে জ্বলতে আর নিভতে শুরু করেছে | পাশে তাকিয়ে দেখি সঞ্জয় উঠে বসে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে হলে রাখা ক্যাবিনেটের দিকে | অনেক জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি দেখছো ? কিসের দিকে তাকিয়ে আছো?’ তার উত্তরে একটাই কথা …… ‘ফোনটা দাওতো একবার’. ফোন হাতে পেয়ে সঞ্জয় ডায়াল করলো সেই হোমস্টের মালিককে, তিনি কোথায়? একবার আসতে পারবেন কিনা সেই বাড়িতে জানতে চাওয়ায় উত্তর এলো তিনি শহরের বাইরে থাকেন আর সেই কেয়ারটেকার ভদ্রলোকও থাকেন না সেই বাড়িতে | তাই পরদিন সকাল ছাড়া কোনো ভাবেই তার বা অন্যকারোর সেই বাড়িতে আসা সম্ভব নয় |

আজ যখন গল্পটা লিখছি বেশ রোমাঞ্চকর লাগছে বটে কিন্তু সেই মুহূর্তে দমবন্ধ হয়ে আসছিলো ভয়ে | কোথায় পালিয়েছে ঘুম, দুজনে একে অপরের হাত ধরে বসে আছি বিছানায়, লাইট নিজের মতো জ্বলছে আর নিভছে | হলে রাখা টিভি ক্যাবিনেটে টেডি বিয়ারগুলোর জ্বলন্ত চোখগুলো মনে হচ্ছে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে | ভূতের গল্পে বা সিনেমায় যেমনটা বর্ণনা পরে বা দেখে এসেছি ঠিক তেমনটাই ঘটেছিলো সেই রাতে আমাদের সাথে |

 ঘড়ির  কাঁটার টিকটিক শব্দ পরিবেশটাকে আরো ছমছমে করে তুলছিল | হাড়হিম করা পাহাড়ি ঠান্ডা হাওয়া ঘরের  জানালা দিয়ে ঢুকতে লাগলো, বুঝতে পারলাম ঘরের বন্ধ জানলাটা কোনোভাবে খুলে গেছে কিন্তু সেদিকে তাকাবো বা উঠে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করবো, সেই সাহস জুগিয়ে উঠতে পারলাম না | এইভাবে বসে থাকতে থাকতে কখন যে ক্লান্ত শ্রান্ত শরীর ও মন জবাব দিয়ে দিয়েছিলো তা বুঝতেও পারিনি |

পরদিন সকালে চোখ খুলে দেখি পাশে সঞ্জয় বসে ঘুমোচ্ছে, জানালার বাইরে চোখ যাবে দেখতে পেলুম সুদূর বিস্তৃত চাবাগানে ঘেরা পর্বতমালা, যতদূর চোখ যায় শুধুই সবুজ চা-বাগানের পরিধি | না আছে অন্য কোনো বাড়ি, না আছে কোনো জনবসতি | একমেবাদ্বিতীয়ম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চা-বাগানের মাঝে অবস্থিত এই বাড়ি | রাতের অন্ধকারে সরু গলি ছাড়া আর কিছুই বোঝা যায়নি বাড়িটার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ |

সকালে আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে বাড়িওয়ালার অপেক্ষা না করেই বেরিয়ে পড়লাম আমরা | সেদিন রাতে কি হয়েছিল, কেন হয়েছিল আজও আমরা বুঝে উঠতে পারিনি আর এটাও ঠিক বোঝার চেষ্টাও করিনি | যা ঘটেছিলো তা রয়ে গেছে আমাদের মনে আর রয়ে গেল আমার লেখা এই ‘ভ্রমণ কাহিনী’-তে |

বি: দ্র: সুযোগ পেলে আপনারা অতি অবশ্যই ঘুরে আসুন ভালপারাই ! আরো জানতে খোঁজ করতে পারেন ওদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটএ !

 

You may also like...

1 Response

  1. Rangan says:

    বাঃ কি দুর্দান্ত লেখনী… রোদ্দুরের মতো নিখাদ একদম… দারুণ লাগলো…প্রকৃত গুণী মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *