বিশ্বাসঘাতক মেঘনাদের অন্তর্জলীযাত্রা- ৪

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, রাবণ শিবকে খুশি করার জন্য তপস্যা করেছিলেন। তিনি তাঁর দশটি মাথা একটি একটি করে কেটে যজ্ঞের আগুনে আহুতি দিচ্ছিলেন। এতে শিব সন্তুষ্ট হয়ে আহত রাবণকে সুস্থ করে তুলতে আসেন। শিব যেহেতু এখানে বৈদ্য বা চিকিৎসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তাই এখানে শিবকে বলা হয় বৈদ্যনাথ। আর জায়গাটার নাম হয় বৈদ‍্যনাথধাম।

ফেব্রুয়ারি ১৯০৮।

দেওঘর সংলগ্ন দিঘিরিয়া পাহাড়ের পাদদেশে দণ্ডায়মান তিন বাঙালি বিপ্লবী। তাঁদের কাছে রয়েছে একটা বোমা, উল্লাসকর ‘দত্ত’! বোমার বিস্ফোরণের একটা তুল্যমূল্য বিচারের জন্য প্রয়োজন ছিল একটা জনমানবশূন্য পাণ্ডববর্জিত এলাকা… সেই পরিপ্রেক্ষিতে বৈদ্যনাথধাম নির্বাচিত হয়েছিল।

ঠিক হল, প্রফুল্লচন্দ্র চক্রবর্তী বোমাটা ছুঁড়বেন। অপর দুইজন সেই বিস্ফোরণের সাক্ষী থাকবেন। প্রকাণ্ড একটা পাথরের পাশে দাঁড়ালেন প্রফুল্লচন্দ্র। বোমাটা ছুঁড়ে তিনি ঐ পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়বেন, এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। দুই বন্ধু আড়ালে চলে গেলেন। বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে হাসতে বোমা ছুঁড়লেন প্রফুল্লচন্দ্র। প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটলো! দুই বন্ধু বেরিয়ে এলেন প্রফুল্লচন্দ্রের পিঠ চাপড়াতে। দেখলেন, প্রফুল্লচন্দ্রের দেহ পড়ে আছে… মাথাটা নেই!

বোমায় বিস্ফোরক তথা দাহ্য পদার্থ এত বেশি ছিল, নির্দিষ্ট সময়ের দুই তিন সেকেন্ড আগেই বায়ুর ঘর্ষণ জনিত উত্তাপে বোমাটা ফেটে যায়।

পাথুরে শক্ত জমিতে কবর দেওয়া সম্ভব নয়। চিতা জ্বালিয়ে দেহ দাহ করা আর‌ও অসম্ভব। বাঙলাদেশের প্রথম শহীদ প্রফুল্লচন্দ্র চক্রবর্তী-কে শুধুমাত্র নরখাদক আর শকুনের ভরসায় রেখে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন অপর দুইজন বিপ্লবী।

অনন্যোপায় হয়েই প্রফুল্লচন্দ্রের পিতা ঈশানচন্দ্র-কে এই দুর্ঘটনার কথা জানান বিপ্লবীদ্বয়। সদ্য পুত্রশোকপ্রাপ্ত পিতা তখন পাষাণ…

… বিদায় লগ্নে সাশ্রুলোচনে নতমস্তকে প্রস্থানোদ্যত বিপ্লবীদের প্রতি ঈশানচন্দ্র রেখেছিলেন একটি অনুরোধ…

“… যাবে? যাও। কিন্তু ওঁদের বলো। আমার আরো একটা পুত্র আছে। সুরেশ। এবার কি সে তোমাদের সাথে যেতে পারে?…”

**************************************************************************************************************************

ভগবান শিবের অনুগ্ৰহে প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন রাবণ। যজ্ঞের আগুন আহুতি দেওয়া দশটা মাথাই তিনি ফেরৎ পেয়েছিলেন। বিপ্লব-যজ্ঞের বোমার আগুনে প্রফুল্লচন্দ্র চক্রবর্তী আহুতি দিয়েছিলেন নিজের মাথা। তাতে ভগবান শিবের প্রতিক্রিয়া বা আনুগত্য প্রফুল্লচন্দ্র পেয়েছিলেন কিনা, জানা নেই। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ হলেও আমাদের ইতিহাসে তিনি ব্রাত্য। বৈদ্যনাথধামে ২২ টি শিবমন্দিরের পাশাপাশি একটা জায়গাতেও প্রফুল্লচন্দ্র চক্রবর্তী-র স্মরণে কোন স্তম্ভ বা স্মারক আছে বলে মনে হয় না। তবুও তিনি বিপ্লব-যজ্ঞের একটা অধ্যায়ের প্রাণপুরুষ।

প্রফুল্লচন্দ্র চক্রবর্তী, বীরেন দত্তগুপ্ত, কানাইলাল দত্ত… এমন শত শত বিপ্লবীদের বিপ্লবের নেপথ্যে থেকে গেছেন বিপ্লব-যজ্ঞের মূল ঋত্বিক-রা। কখনও সেই ঋত্বিকের নাম অরবিন্দ ঘোষ, কখনও মাষ্টারদা সূর্য সেন… মাঝখানে ছিলেন সেই ব্যাক্তি, যাঁর জীবনী তুলে ধরার চেষ্টা করছি আপনাদের আন্তর্জাতিক আদালতে!

সেই ‘বিশ্বাসঘাতক মেঘনাদের অন্তর্জলীযাত্রা’ -র আন্তর্জাতিক আদালতের শুনানিতে, আপনি আসবেন তো পাঠক?

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *